সেন্সর বোর্ড বাতিল‘হাওয়া’র বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারসহ নির্মাতা-শিল্পীদের ৫ দাবি

Header

রির্পোটিং :  আলোচিত চলচ্চিত্র ‘হাওয়া’র বিরুদ্ধে মামলা এবং ‘শনিবার বিকেল’ ছবির মুক্তি আটকে রাখার ঘটনায় সরব হয়েছেন দেশের নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা। শিল্পীরা মনে করেন, কাঁটাতারের ভেতরে তাঁদের বসবাস করতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দেশের সংস্কৃতি, প্রগতি এবং সব শিল্পমাধ্যম এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি হুমকির সম্মুখীন হয়ে আছে। নিজেদেরকে সংকীর্ণতা, বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গির অভাব আর ‘অদ্ভুত রাজনৈতিক’ খেলার সহজ শিকার মনে করে নিজেদের কাঁটাতারের ভেতরে রেখে ভিন্ন রকম প্রতিবাদে শামিল হলেন এবার।

বৃহস্পতিবার সেগুনবাগিচার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘বাংলা চলচ্চিত্র বা কনটেন্টে সেন্সরশিপের খড়গ/গল্প বলার স্বাধীনতা চাই’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ হিসেবে নিজেদের কাঁটাতারের বেড়ার ভেতর রেখে প্রতিবাদ ও বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে মেজবাউর রহমান সুমনের ‘হাওয়া’ সিনেমার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের দাবি ও মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ সিনেমার ছাড়পত্র না পাওয়ার ব্যাখ্যা চান শিল্পী-নির্মাতা-কলাকুশলীরা। তাঁদের বক্তব্যে ছিলে গল্প বলার স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ। সেন্সর বোর্ড বাতিলসহ পাঁচ দফার কথা।

সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা জানান, সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে নির্মাতা, শিল্পী-কলাকুশলীরা গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করবেন এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রীকে স্মারকলিপি দেবেন।সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নির্মাতা ও শিল্পীদের পক্ষে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন তথ্যচিত্র ‘হাসিনা অ্যা ডটার্স  টেল’-এর নির্মাতা পিপলু আর খান। তিনি বলেন, “আমাদের অস্তিত্ব আজ বিপন্ন। সাম্প্রতিককালে হাওয়া সংক্রান্ত আলোচনা-সমালোচনা, আইনি হুমকি এবং বিগত বছরগুলোতে ক্রমবর্ধমান হারে বৃদ্ধি পেতে থাকা আইনি হুমকি থেকে মনে হচ্ছে, চলচ্চিত্র ও অন্যান্য শিল্পমাধ্যম নিয়ে এই দেশে এক অদ্ভুত অবস্থা বিরাজ করছে। সংকীর্ণতা, নিয়ন্ত্রণ আর অবহেলায় আমরা বারবার আটকা পড়ে যাচ্ছি। সেন্সরশিপ নানাভাবে আমাদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘শনিবার বিকেল’ অজানা কারণে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে। ”

চলচ্চিত্রের ওপর রিট ও মামলা করাকে ‘পাথর মারা সংস্কৃতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে লিখিত বক্তবে বলা হয়, ‘সমাজের অসংগতির জন্য আমরা তো প্রতিদিন রিট করতে পারব না। আপনাদের এখতিয়ার আছে বলে যখন-তখন রিট, মামলা, হামলা কেন? যেখানে গল্প বললে শিল্পীর দিকে পাথর নিক্ষেপ করা হবে সেখানে একজন শিল্পী কেন গল্প বলবেন? এটা তো পাথর ছুড়ে মারার সংস্কৃতি। ভয়ের সংস্কৃতি। ’সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সংস্কৃতিজন নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, গাউসুল আলম শাওন, অমিতাভ রেজা চৌধুরী, মেজবাউর রহমান সুমন, তারিক আনাম খান, মোরশেদুল ইসলাম, কামার আহমাদ সাইমন, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, জাহিদ হাসান, জয়া আহসান ও আফরান নিশো। সবার বক্তব্যেই শিল্পের স্বাধীনতা, গল্প বলার অধিকার এবং ‘হাওয়া’ সিনেমার পরিচালকের বিরুদ্ধে মামলা ও ‘শনিবার বিকেল’-এর মুক্তির অনুমতি না দেওয়া প্রসঙ্গটি ঘুরেফিরে এসেছে।

‘হাওয়া’ চলচ্চিত্র নিয়ে করা মামলা প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তবে পিপলু আর খান বলেন, “বাস্তব দুনিয়ায় সংঘটিত কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে যে আইন বলবৎ হয় তা ফিকশনাল রিয়ালিটি বা তৈরি করা বাস্তবতার ওপর প্রয়োগ করা হলে শিল্প-সাহিত্য-সংগীত-চলচ্চিত্র কিছুই করা সম্ভব না। প্রসঙ্গ না বুঝে আইন প্রয়োগ করলে শিল্পও হবে না; আইনের শাসনও হবে না। ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রে যে শালিক দেখানো হয়েছে তা একটি তৈরি করা বাস্তবতার অংশ। ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রে যে জনগোষ্ঠীর জীবন দেখানো হয়েছে, তার বাস্তবানুগ উপস্থাপনার জন্য তাদের সহজাত ভাষাভঙ্গির রীতিকে তুলে ধরা হয়েছে। এতে সংলাপে যতটুকু গালি উঠে এসেছে তা চলচ্চিত্রায়ণের প্রয়োজনেই। একই কারণে দৃশ্যায়িত হয়েছে হত্যা ও মৃত্যুর দৃশ্যগুলোও। ”সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত নির্মাতা, শিল্পী ও কলাকুশলীরা সবার পক্ষ থেকে পাঁচটি দাবি উত্থাপন করেন। দাবিগুলো হলো : ১. ‘হাওয়া’ চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে করা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। ২. ‘শনিবার বিকেল’ চলচ্চিত্র কেন সেন্সর ছাড়পত্র পেল না তার সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। ৩. বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ড বাতিল করতে হবে এবং প্রস্তাবিত চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইনের ক্ষেত্রে সকল অংশীজনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন প্রণয়ন করতে হবে। ৪. প্রস্তাবিত ওটিটি নীতিমালার ক্ষেত্রে সকল অংশীজনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ওটিটি নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। ৫. চলচ্চিত্র বা কনটেন্ট বিষয়ক কোনো মামলা দায়ের করার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে নিতে হবে।সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নাসির উদ্দীন ইউসুফ, তারিক আনাম খান, মোরশেদুল ইসলাম, গিয়াস উদ্দীন সেলিম, আফসানা মিমি, মেজবাউর রহমান সুমন, গাউসুল আলম শাওন, ইরেশ যাকের, চঞ্চল চৌধুরী, আজমেরী হক বাঁধন, বিধান রিবেরু, সৈয়দ আহমেদ শাওকি, কামার আহমাদ সাইমন, অমিতাভ রেজা, জাকিয়া বারী মম, নুরুল আলম আতিক, শিবু কুমার শীল, জয়া আহসান, নাজিফা তুষী, শম্পা রেজা, আফরান নিশো, গিয়াস উদ্দিন সেলিম, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, তানিম নুর, আদনান আল রাজিব, জাহিদ হাসান, রেদওয়ান রনিসহ শিল্প-সংস্কৃতির অনেকে।

সংবাদ সম্মেলনে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, “দর্শক যে মুহূর্তে হলে ফিরেছেন সেই সময়ে ‘হাওয়া’র নির্মাতার বিরুদ্ধে মামলা ভালো ইঙ্গিত নয়। ‘শনিবার বিকেল’-এর সেন্সর কেন দেওয়া হলো না তার সুস্পষ্ট জবাব চাই। যেখানে সংবিধানে মতপ্রকাশের অধিকার দেওয়া হয়েছে সেখানে শিল্পে কেন স্বাধীনতা থাকবে না?”‘হাওয়া’র নির্মাতা মেজবাউর রহমান সুমন বলেন, ‘সেন্সরশিপের কারণে আমরা নিজেদের মধ্যে মজা করে বলতাম, সিনেমা বানাতে হবে ফুল, পাখি, লতাপাতা নিয়ে। এখন দেখছি সেই তালিকা থেকে পাখিকে বাদ দিতে হবে। আমি নিজেই এখন খাঁচায় ঢুকে গেলাম। পরের গল্পটা আমি কিভাবে বলব? আমাদের সিনেমায় দেখানো পাখিটাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। বাস্তব জীবনের আইন সিনেমার জন্য প্রযোজ্য হতে পারে না। ’

অভিনেত্রী জয়া আহসান তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘কোনো শিল্পকলা আসলেই কি কোনো শর্ত মেনে হতে পারে? কোনো চলচ্চিত্র কি শর্তসাপেক্ষে তৈরি হতে পারে? আমার মতে, এটা কোনোভাবেই হতে পারে না। প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে আমার নিজের একটা খাঁটি আবেগ আছে। সেই জায়গা থেকে প্রাণ-প্রকৃতি নিয়ে আমি আরো বেশি কথা বলব। তাই বলে কি চলচ্চিত্র বন্ধ করতে হবে? বন উজাড় হচ্ছে, দিনের পর দিন পশুপাখির সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে, এগুলোর বেলায় বন বিভাগ বা প্রশাসন কোথায়? চলচ্চিত্রের বেলায় প্রশাসনের এতটা চাপ কেন? সব চরিত্র যদি নিয়ম মেপে চলতে থাকে তাহলে তো কোনো ফিকশনই তৈরি হবে না। আমরা কি তাহলে চলচ্চিত্র নির্মাণ করব না? আমরা কি তাহলে গল্প বলব না?’জয়া আহসান আরো বলেন, “‘শনিবার বিকেল’ সিনেমাটি নিয়ে এখন কথা হচ্ছে। এটা নিয়ে আমরা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি। হলি আর্টিজানের ঘটনা কি আসলে ঘটেনি? ঘটেছে তো। সেগুলো নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। পহেলা এপ্রিল এলে পত্রপত্রিকায় লেখা হচ্ছে। কিছুদিন আগে লেখক শাহিন আখতার একটি উপন্যাস রচনা করলেন। সেগুলো কি আমরা আটকাতে পেরেছি? চলচ্চিত্রের বেলায় কী অসুবিধা? আমার জন্মদিন ১ জুলাই। হলি আর্টিজানের ঘটনা নিয়ে আমি এতটা ট্রমাটাইজ হয়ে আছি যে আমার জন্মদিনটা আমি পালন করতে পারি না। আমার মনে হয় ওই দিনটিতে একটা কালো দাগ লেগে গেছে। ”

সম্মেলনে অভিনেতা তারিক আনাম খান বলেন, “কাঁটাতারের মধ্যে কথা বলছি, এ অভিজ্ঞতা প্রথম। আমরা এখন কোনো কিছু নির্মাণ করতে গেলে আগে ভাবি কী দেখানো যাবে, কী দেখানো যাবে না। আমি ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত। এটা দেখানো যাবে না, ওটা করা যাবে না, এভাবে কোনো দিন নতুনরা এগোতে পারবে না। আমরা সেলফ সেন্সরশিপে আটকে গেছি। অনেকগুলো ‘না’-এর ফাঁদে পড়ে যাচ্ছি। ”

নির্মাতা মোরশেদুল ইসলাম বলেন, “আমি সেন্সর বোর্ডের সদস্য ছিলাম। সেখানে অদ্ভুত সব নিয়ম আছে। সার্টিফিকেশন আইন আরো জঘন্য। এর মুক্তি কোথায় জানি না। এটা ষড়যন্ত্রের অংশ। ‘শনিবার বিকেল’ সিনেমাটি দেখেছি। বলা হচ্ছে, হলি আর্টিজান নিয়ে বানানো হয়েছে সিনেমাটা, দর্শকরা হয়তো এর সঙ্গে কিছু মিল পাবেন। কিন্তু এক শটে নির্মিত এই ছবিতে যে পরিমিতিবোধ আছে, তাতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে না। এটি দেখলে যে কেউ বাংলাদেশ সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা পাবে। সব সিনেমা মুক্তভাবে বানাতে চাই আমরা। কিন্তু ভাবতে হচ্ছে কতটুকু দেখাব, কতটুকু দেখাব না। ”

‘শনিবার বিকেল’ নিয়ে নির্মাতা ফারুকী বলেন, ‘আপনাদের মতো আমিও জানি না, কেন সেন্সর পাচ্ছে না আমার সিনেমাটি। মুক্তির জন্য সাড়ে তিন বছর ধরে অপেক্ষা করছি। সরকারকে বলতে চাই শিল্পকর্ম হলো গাড়ির হেডলাইটের মতো, এটি বন্ধ করে যদি ভাবেন যে, সামনে কোনো বিপদ নেই তাহলে কোনো লাভ নেই; বরং হেডলাইটটা থাকলে সামনের বিপদটা দেখতে পাবেন। বুঝতে পারবেন বাঁচতে হলে ডানে বা বামে আপনাকে যেতে হবে। আমি মনে করি, হেডলাইট বন্ধ করা যে কোনো সমাধান নয় তা আমাদের বোঝার সময় এসেছে। ’

ads
ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *