পি কে হালদারের নাম মীরজাফরের মতো গালি হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে

Header

রির্পোটিং বিশেষ প্রতিনিধি : ভারতের ব্যাঙ্কশাল স্পেশাল সিবিআই কোর্ট বাংলাদেশ থেকে পালানো অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের অভিযোগে প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের তিনদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।শনিবার (১৪ মে) দিনগত গভীর রাতে পি কে হালদারসহ ছয়জনকে ব্যাঙ্কশাল সিবিআই কোর্টে হাজির করা হয়। এরপর আদালত তাদের তিনদিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেন।বিশ্বস্ত সূত্রের খবর, বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে তড়িঘড়ি অনলাইনে পেপার সাবমিট করে স্পেশাল সিবিআই কোর্টে ওই ছয়জনকে হাজির করা হয়। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে এই খবর চেপে রাখা হয়েছিল।

রবিবার (১৫ মে) সকালে অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি) জানায়, পি কে হালদারকে তিনদিনের রিমান্ডে নিয়ে নিজেদের হেফাজতে রেখেছে ইডি। একইসঙ্গে প্রাণেশ হালদার ওরফে প্রীতিশের স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে জেলে পাঠানো হয়েছে।শনিবার (১৪ মে) সকালে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ মাথায় নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমানো এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পি কে হালদারসহ ছয়জনকে পশ্চিমবঙ্গের অশোকনগর থেকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার অন্য পাঁচজন হলেন- উত্তম মিত্র, স্বপন মিত্র, সঞ্জীব হালদার, প্রাণেশ হালদার (প্রীতিশ) ও তার স্ত্রী।

“পিকে হালদারের যেসব বান্ধবীর মাধ্যমে দুর্নীতি করেছেন”ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেফতারের পর দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ জালিয়াত পিকে হালদার (প্রশান্ত কুমার হালদার) এখন ‘টপ অব দ্য কান্ট্রি’। এমনকি দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির খবর ছাপিয়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি। বিদেশে তার সম্পদের পাহাড় গড়ার খবর এখন সবার মুখে মুখে। পাশাপাশি পিকের বান্ধবী প্রীতির তথ্যও চলে এসেছে সামনে। শুধু কলকাতা বা কানাডায় সম্পদের পাহাড় নয়, দেশেও তার ১৫ বান্ধবী ও ঘনিষ্ঠ নারীদের ব্যাংক হিসাবে পাওয়া গেছে অন্তত ৮৬৭ কোটি টাকা। উপহার, গাড়ি ও ফ্ল্যাট ক্রয়, দেশে-বিদেশে ভ্রমণসহ নানা অজুহাতে তাদের দেওয়া হয়েছে এই মোটা অঙ্কের অর্থ। পিপলস লিজিংসহ চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে এ অর্থ নারীদের নামে-বেনামের হিসাবে স্থানান্তর করা হয়। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

দুদক সূত্র জানায়, পিকে হালদার তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বান্ধবী অবন্তিকা বড়ালকে ধানমন্ডিতে ৪ কোটি ৩৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকার একটি ফ্ল্যাট (বাড়ি নং-৩৯, রোড নং-১০/এ) কিনে দেন। অবন্তিকা তার আয়কর নথিতে ওই মূল্য প্রদর্শন না করে গোপন করেন। তার ব্যাংক হিসাবেও ১০ কোটি টাকার বেশি স্থানান্তর করা হয়। যা চারটি আর্থিক খাত থেকে হাতিয়ে নেন পিকে হালদার। পিকে হালদারের দুর্নীতি ও অর্থ পাচারে সহযোগিতা, অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ গুরুতর অভিযোগে অবন্তিকা বড়ালকে অনেক আগেই গ্রেফতার করেছে দুদক।

দুদকের জালে আটকে পড়া পিকে হালদারের আরেক ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নাহিদা রুনাই। রুনাই ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল লিজিং ফাইন্যান্সের হেড অব বিজনেস। তার কথায় চলত ওই প্রতিষ্ঠান। তার কথায় অনেক কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে ঋণের নামে কোটি কোটি টাকা বের করে দেওয়া হয় বলে বিএফআইইউর কাছে তথ্য রয়েছে। তার নিজের হিসাবেও স্থানান্তর করা হয়েছে বিপুল অঙ্কের অর্থ। রুনাইকেও গ্রেফতার করেছে দুদক। অবন্তিকা ও রুনাই-দুজনেই এখন কারাগারে।

পিকে হালদারের বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন রুনাই। পাপিয়া নামক এক নারীকে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের পরিচালক দেখিয়ে আরেকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান এফএস থেকে ১২০ কোটি টাকা তুলে দেন। শুভ্রা রানী নামের এক নারীকে ৮০ কোটি টাকা দেন। সুস্মিতা নামে এক নারীকে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার দেখিয়ে ৭০ কোটি টাকা ঋণের নামে বের করে দেন পিকে হালদার। লামিয়া নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এক নারী সহকর্মীকে তিনি বিদেশে ঘুরতে নিয়ে যেতেন। সুন্দরী ওই তরুণী দুদকের কাছে জবানবন্দিতে তা স্বীকারও করেছেন। একইভাবে সাজিয়া রহমান নামে ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের আরেক সুন্দরী তরুণী সহকর্মীকে বিভিন্ন মদের পার্টিতে নিয়ে যেতেন পিকে হালদার। তিনি তার অবৈধ অর্জিত অর্থ হস্তান্তর, স্থানান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে বান্ধবীসহ ঘনিষ্ঠদের নামে সরিয়ে নেন।

আরও জানা গেছে, কখনো ঋণের নামে, কখনো বিনোদন ভাতার নামে আবার কখনো অবৈধ টাকা আড়াল করতে পিকে হালদার বান্ধবীর নামে ব্যাংকে টাকা স্থানান্তর করেন। তাদের কিনে দেন দামি ফ্ল্যাট ও গাড়ি। শিমু রয় নামে তার আরেক ঘনিষ্ঠ নারীর নামে ৬৫ কোটি টাকা সরানো হয়। এ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার জন্য রেপটাইলস ফার্ম নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে এ টাকা নেওয়া হয়। পূর্ণিমা রানী নামের একজনকে এমটিবি মেরিন লিমিটেড নামক কাগুজে প্রতিষ্ঠান দেখিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা তুলে দেন পিকে হালদার। হলি নামে একজনকে ৭০ কোটি টাকা তুলে দেওয়া হয়। আরেক নারী অবন্তিকার নামে একটি কাগুজে প্রতিষ্ঠানের বিপরীতে ঋণ দেখিয়ে ৮৪ কোটি টাকা তুলে দেন পিকে হালদার। তার বান্ধবী সুপ্তি চৌধুরীর নামেও বিপুল অর্থ সরানো হয়। তিনি গোপনে কানাডায় পাড়ি জমিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। ঋণের নাম করে শাহনাজ নামে এক নারীকে ৬০ কোটি টাকা, সুস্মিতাকে ৬২ কোটি টাকা, সামিয়া বেগমকেও প্রায় একই পরিমাণ অর্থ দেন পিকে হালদার। অনিন্দিতা মৃধা নামে এক নারীকে উইন্টেল ইন্টারন্যাশনাল নামক ঠিকানাবিহীন কাগুজে প্রতিষ্ঠানকে ৭০ কোটি টাকা কৌশলে তুলে দেন। পিকে হালদারের সঙ্গে এই অনিন্দিতাও গ্রেফতার হয়েছেন বলে জানা গেছে। পিকে তার ঘনিষ্ঠ অতশীকে দেন ৮০ কোটি টাকা। এদের সবাইকে এখনো আইনের আওতায় আনতে পারেনি দুদক। তবে এদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

পিকে হালদার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএলএফএসএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। এ মামলায় দুই দফায় পিকে হালদারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও ফ্রিজ করা হয়। তবে আর্থিক খাত থেকে আত্মীয়স্বজন চক্রের মাধ্যমে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ নিয়ে রাষ্ট্রীয় দুটি প্রতিষ্ঠান তদন্ত করছে। তদন্ত সংস্থার অনুরোধেই ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের এনফোর্সমেন্ট বিভাগের কর্মকর্তারা পশ্চিমবঙ্গে অভিযান চালিয়ে পিকে হালদার, তার ভাই প্রীতিশ হালদারসহ ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে।

জানা গেছে, বান্ধবী ও ঘনিষ্ঠ নারী ছাড়াও পিকে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, ভাই প্রিতিশ কুমার হালদার ও তার স্ত্রী সুস্মিতা সাহা, খালাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অভিজিৎ অধিকারী, মামাতো ভাই শঙ্খ ব্যাপারিসহ আত্মীয়স্বজন, বন্ধু একেএম শহীদ রেজাসহ ৮২ জনের নামে নামসর্বস্ব কোম্পানি গঠন কিংবা তাদের প্রতিষ্ঠানের নামে টাকা পাচার করা হয়েছে একাধিক সংস্থার অনুসন্ধানে তথ্য মিলেছে।

পিকে হালদারের বাড়ি পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের দিঘিরজান গ্রামে। গ্রেফতারের পর সেখানেও চলছে নানা আলোচনা।

“পিকে হালদারের বান্ধবীরা কারাগারে যেমন আছে”পালিয়ে থেকেও শেষ রক্ষা হয়নি হাজার কোটি টাকা পাচারকারী প্রশান্ত কুমার হালদার (পি কে হালদার)। শনিবার (১৪ মে) পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হয়ে তিন দিনের রিমান্ডে রয়েছেন তিনি। যদিও পিকের অপকর্মের সহযোগী তার দুই বান্ধবী নাহিদা রুনাই ও অবন্তিকা বড়ালকে গত বছরই গ্রেপ্তার করা হয়। বর্তমানে তারা কারাগারেই আছেন।

অবৈধ সম্পদ অর্জনের মামলায় অবন্তিকাকে গত বছর ১৩ জানুয়ারি এবং নাহিদা রুনাইকে ১৬ মার্চ গ্রেপ্তার করা হয়। দুজনকেই রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তারা দুজনই এখন গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কারাগারে বন্দি। রাখা হয়েছে আলাদা সেলে।

কারাগার সূত্র বলছে, পিকের দুই বান্ধবী শারীরিকভাবে ভালো আছেন। অন্য বন্দিদের সঙ্গে গল্প করে সময় কাটে তাদের।

জানা গেছে, পি কে হালদারের বান্ধবীদের বড় বহরের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ছিলেন অবন্তিকা বড়াল ও নাহিদা রুনাই। আর্থিক অনিয়মের অন্যতম সহযোগী হওয়ায় পি কে তাদেরকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। এই দুই বান্ধবীকে পি কে পৃথক পৃথক ২০ থেকে ২৫ বার সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডে প্রমোদ ভ্রমণ করেছেন।

এদিকে গত বছরের মার্চে দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম সংবাদ প্রকাশ হয়, পি কে হালদার ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর বেনাপোল দিয়ে বিদেশে পালিয়ে যান। তখন কানাডায় তার বসবাসের খবর আছে। তারপর থেকেই তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালাতে থাকে সরকার। অবশেষে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নাম পরিবর্তন করে বসবাসের খবরে শনিবার (১৪ মে) অভিযান চালিয়ে পিকেসহ ছয় জনকে গ্রেপ্তার করে ভারতের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)।

জানা গেছে, পি কে হালদার নাম পাল্টে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার অশোক নগরের একটি বাড়িতে আত্মগোপনে ছিলেন। সেখানে শিবশঙ্কর হালদার পরিচয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নেন তিনি। এ ছাড়া ভারতে একাধিক অভিজাত বাড়িসহ বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন তিনি।

উল্লেখ্য, দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার করেন পি কে হালদার। দুদক তার ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ৩৪টি মামলা করেছে। এসব মামলায় এক ডজনেরও বেশি ব্যক্তি কারাগারে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ১১ জন দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন।

“কে এই পি কে হালদার”বহুল আলোচিত তিন হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাটকারী প্রশান্ত কুমার (পিকে) হালদার একজন গরিব দর্জির ছেলে। সাধারণ পরিবারের সন্তান হয়েও প্রশান্ত বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ও বিত্ত-বৈভবের মালিক বনে গেছেন। দেশে-বিদেশে তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ফ্ল্যাটসহ বিপুল সম্পত্তি রয়েছে।

শনিবার পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে পিকে হালদার গ্রেফতার হয়েছেন। এ গ্রেফতারের পর তিনি আবার আলোচনায় এসেছেন। কলকাতায় প্রশান্তের বিলাসবহুল ১০টি বাড়ি সিলগালা করা হয়েছে। তার অর্থ লোপাটের সহযোগীরাও সাধারণ পরিবার থেকে উঠে আসা। সবার বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, আলোচিত পিকে হালদারের বাবা প্রণবেন্দু হালদার পেশায় ছিলেন দীঘিরজান বাজারের একজন দর্জি। আর মা লীলাবতী হালদার ছিলেন স্কুলশিক্ষক। দীঘিরজান মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও পাশের বাগেরহাটের সরকারি পিসি কলেজ থেকে তিনি এইচএসসি পাশ করেন।

এরপর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি নিয়ে তিনি বেক্সিমকো গ্রুপের জুট ফ্যাক্টরিতে চাকরি করেন। ১৫-১৬ বছর আগে ভিন্ন ধর্মের এক নারীকে বিয়ে করার পর থেকে তিনি গ্রামছাড়া। পিকে হালদারের অর্থ পাচারের কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর লীলাবতী আরেক ছেলে প্রীতিশ হালদারের বাড়ি ভারতের অশোকনগরে চলে যান। পিকে হালদারের আরেক ভাই প্রাণেশ হালদার কানাডায় অবস্থান করছেন জানা গেছে।

দীঘিরজান গ্রামের অধ্যক্ষ দীপ্তেন মজুমদার জানান, প্রশান্তকে (পিকে) মেধাবী ছাত্র বলে এলাকাবাসী চিনত। দীর্ঘদিন ধরে এলাকার সঙ্গে তার তেমন কোনো যোগাযোগ নেই। সবাই জানত প্রকৌশলী হয়ে তিনি অনেক বড় চাকরি করেন। ১৫-১৬ বছর আগে তিনি এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করেছেন বলে গ্রামে প্রচার হয়। কুষ্টিয়ায় তার একটি জুট মিলসহ কোটি কোটি টাকার ব্যবসার কথা জানে সাধারণ মানুষ।

১০ বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতা নিয়েই ২০০৯ সালে পিকে হালদার অদৃশ্য আশীর্বাদে রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের এমডি বনে যান। এরপর ২০১৫ সালের জুলাইয়ে এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের এমডি পদে যোগ দেন। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে ও পরে কমপক্ষে চারটি ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের (এনবিএফআই) মালিকানায় অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসে। সেই চার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এখন চরম খারাপ। একটি বিলুপ্তের পথে, বাকি তিনটিও গ্রাহকদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। নানা কৌশল করে এসব প্রতিষ্ঠান দখল করেন পিকে হালদার। প্রতিষ্ঠান দখল করার জন্য নামে-বেনামে অসংখ্য কোম্পানি খুলেছেন, শেয়ারবাজার থেকে বিপুল পরিমাণ শেয়ার কিনেছেন, দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণের নামে টাকাও সরিয়েছেন। এমনকি দেশের বাইরেও তিনি কোম্পানি খোলেন।

২০১৪ সালে কানাডায় পিঅ্যান্ডএল হাল হোল্ডিং ইনক নামে কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন পিকে হালদার। কানাডা সরকারের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী-টরেন্টোর ডিনক্রেস্ট সড়কের ১৬ নম্বর বাসাটি তার। এছাড়া ২০১৮ সালে দুই ভাই (প্রশান্ত ও প্রীতিশ) মিলে পশ্চিমবঙ্গে হাল ট্রিপ টেকনোলজি নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। কলকাতার মহাজাতি সদনে এর কার্যালয়। ২০১৯ সালের মাঝামাঝিতে তার দখল করা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের টাকা ফেরত দিয়ে ব্যর্থ হলে পিকে হালদার ভারতে পালিয়ে যান। এরপর তিনি কানাডা ও সিঙ্গাপুরে বসবাস শুরু করেন। তবে সম্প্রতি তিনি আবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন।

বর্তমানে পিকে হালদারের গ্রামের বাড়িতে পুরোনো একটি কাঠের টিনশেড ঘর আছে। যেখানে তার চাচাতো ভাই দীপেন্দ্র নাথ হালদার বসবাস ও দেখাশোনা করেন। দীপেন্দ্র জানান, এ বাড়ি তিনি দেখাশোনা করছেন। কিন্তু প্রশান্ত বা তার ভাইয়েরা কেউই তাদের খোঁজখবর রাখেন না। প্রশান্তের অর্থ কেলেঙ্কারির খবর শোনার পর থেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে তিনি ভয় ও শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। পিকে হালদারের অন্যতম সহযোগী বোন মঞ্জু রানীর দুই ছেলে স্বপন মিস্ত্রি ও উত্তম মিস্ত্রি। এ দুজনের ব্যাংক হিসাব জব্দ করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ দুজনও শনিবার কলকাতায় গ্রেফতার হয়েছেন।

পিকে হালদারের ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনা করেন ম্যানেজার অঙ্গন হালদার। দীঘিরজান গ্রামে মা লীলাবতীর নামে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন পিকে হালদার। কলেজটির তত্ত্বাবধায়ক অঙ্গন হালদার। পিকে হালদারের দেহরক্ষীর সঙ্গে মেয়ে অনিন্দিতার বিয়ে দিয়েছেন নাজিরপুর উপজেলার বাকসি গ্রামের সুকুমার মৃধা। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি, খুলনার রূপসা কলেজের অধ্যক্ষসহ একাধিক চাকরি করেন এবং এসব প্রতিষ্ঠান থেকে দুর্নীতির দায়ে চাকরি হারান সুকুমার। নিজ গ্রাম বাকসিতে তিনি রাজলক্ষ্মী ফাউন্ডেশন নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। খাস জমিতে কলেজ, কিন্ডারগার্টেন, বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়, পাঁচটি মন্দির, দুস্থ ছাত্রীনিবাস, বৃদ্ধাশ্রম ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করেন। শনিবার সুকুমারও গ্রেফতার হয়েছেন।

দুদকের হাতে আটক পিকে হালদারের সহযোগী ও বান্ধবী অবন্তিকা বড়াল ওরফে কেয়ার গ্রামের বাড়ি নাজিরপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের আমতলা গ্রামে। পিরোজপুর শহরের খুমুরিয়া এলাকায়ও তাদের বাড়ি রয়েছে। অবন্তিকার বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা অরুণ কুমার বড়াল ছিলেন সরকারি কলেজের প্রভাষক। বাবার মৃত্যুর পর মা ও বোনসহ অবন্তিকা ঢাকায় চলে যান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে খুমুরিয়া এলাকার এক বাসিন্দা জানান, অবন্তিকার বাবা মারা যাওয়ার পর পরিবারটি খুবই দুরবস্থার মধ্যে পড়েছিল। অথচ কয়েক বছরের ব্যবধানে পরিবারটি কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।

এর আগে ভারতে পি কে হালদারের বিপুল পরিমাণ অর্থের সন্ধান পায় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থা। কলকাতায় পি কে হালদারের সহযোগী সুকুমার মৃধার কাছে এ অর্থের সন্ধান মেলে।

শুক্রবার (১৩ মে) সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় ভারতের অর্থ-সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা বাহিনী এনফোর্সমেন্ট ডাইরেক্টরেট (ইডি)।

ইডি জানায়, প্রশান্ত হালদার নামে এক বাংলাদেশি হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করে কানাডায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তারই সহযোগী সুকুমার মৃধা বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনার ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের মাছ ব্যবসায়ী।

সুকুমার মৃধার বাড়ি ও দক্ষিণ ২৪ পরগনায় তার অফিসে তল্লাশি চালায় ইডি। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি মাছের ব্যবসার আড়ালে বিপুল পরিমাণ বেআইনি টাকার লেনদেন করেন। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

“পি কে হালদারকে দেশে ফেরানো সম্ভব”অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনায় আলোচিত পি কে হালদারকে ভারতে গ্রেপ্তারের বিষয়ে বাংলাদেশকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। শনিবার তাকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তারের খবর গণমাধ্যমে আসার পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুজনই বলেছেন, বিষয়টি এখনো তাদের জানানো হয়নি।

এদিকে ভারত থেকে পি কে হালদার ও তার সম্পদ কীভাবে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে এ নিয়ে কৌতূহল দেখা দিয়েছে। কারণ পি কে হালদার নাম পাল্টে পশ্চিমবঙ্গে নাগরিত্ব নিয়ে বসবাস করছেন বলে সে দেশের সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে। সেখানে তার নাম শিব শংকর। রেশন কার্ডসহ ভারত সরকারের অন্যান্য সুবিধাও ভোগ করছেন তিনি।

আইনজীবীরা বলছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বহিঃসমর্পণ আইন ও চুক্তি রয়েছে। এই আইনের আওতায় পি কে হালদারকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে পি কে হালদার ভারতে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেখানে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের হয়েছে কি-না এবং সে মামলায় ভারত সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নেয় তার ওপর নির্ভর করবে কবে কীভাবে তাকে ফিরিয়ে আনা যাবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি মো. খুরশীদ আলম খান  গনমাধ্যমকে জানান, পি কে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের ৩৬টি এবং জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের ১টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে অর্থ পাচারের তিনটি মামলায় ইতিমধ্যে তদন্ত শেষ হয়েছে। আর জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের মামলাটি ঢাকার সংশ্লিষ্ট বিশেষ জজ আদালতে বিচারাধীন। পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনার পর এসব মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হবে। এরপর জিজ্ঞাসাবাদ, তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা সহজ হবে।   অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘বহিঃসমর্পণ আইন ও চুক্তির আওতায় কিছু আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে পি কে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। এ আইনের আওতায় যেকোনো দেশ কোনো আসামিকে সংশ্লিষ্ট দেশে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য। অতীতে এ আইন ও চুক্তির আওতায় অনেককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়াটায় একটু হয়তো সময় লাগতে পারে। আর যেহেতু তিনি নাম পরিবর্তন করে জালিয়াতির মাধ্যমে সেখানে ছিলেন তার বিরুদ্ধে একটি মামলা হতে পারে। এ মামলাটি নিষ্পত্তিতে বেশি সময় হয়তো লাগবে না।’ দুদকের আইনজীবী আরও বলেন, ‘দেশে আনার পরই তিনি শ্যোন অ্যারেস্টের মাধ্যমে আইনের আওতায় আসবেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তার সঙ্গে আর কারা রয়েছেন সে বিষয়টি সামনে আসবে।’ তিনি বলেন, ‘পারস্পরিক সহযোগিতা আইন-২০১২ অনুযায়ী পি কে হালদারের সম্পদ ভারত থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে তা সময়সাপেক্ষ। দুদকের তরফ থেকে আমরাও চেষ্টা করব।’

এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি মোশাররফ হোসেন কাজল গনমাধ্যমকে বলেন, ‘ভারত সরকার পি কে হালদারের বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেছে কি-না, সেখানে তার কোনো অবৈধ সম্পদ রয়েছে কি-না এসব বিষয় সামনে আসবে। আসলে গ্রেপ্তারের পর ভারত সরকার তার বিরুদ্ধে আইনগত কী পদক্ষেপ নেয় সেটার ওপর নির্ভর করবে কবে নাগাদ তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা যাবে। তারা যদি মনে করে যেকোনো আইনগত ব্যবস্থা না নিয়ে বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করবে তাহলে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে।’

ads

আনুষ্ঠানিক তথ্য পায়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া পি কে হালদারকে গ্রেপ্তারের বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য পায়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। গতকাল শনিবার বিকেলে নিজ বাসভবনে এই কথা বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের কাছে অফিশিয়ালি এখনো কোনো খবর আসেনি। খবর এলে পরবর্তীকালে সিদ্ধান্ত নেব। পি কে হালদারের নামে দেশে মামলা থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর আমরা তাকে ফেরত চাইব এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।’

“ পি কে হালদার কে বিচারের মুখোমুখি করা হবে-দুদক চেয়ারম্যান”এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ্ শনিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘আমরা তার (পিকে হালদার) গ্রেফতারের খবর পেয়েছি। যত দ্রুত সম্ভব, তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করব। দেশে এনে তাকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো হবে।’

এবিষয়ে কথা হয় পিকে হালদারের অর্থ লোপাটের অনুসন্ধান ও তদন্তকারী কর্মকর্তা দুদকের উপ-পরিচালক মো. গুলশান আনোয়ার প্রধানের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘পিকে হালদারের সম্পদের বিষয়ে দুদক থেকেই ইডির সঙ্গে যোগাযোগ করে তথ্য দেওয়া হয়েছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতে ভারতের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে শনিবার পিকেসহ কয়েকজনকে আটক করে ইডি। এরপর তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পিকে হালদারকে গ্রেফতার করা হয়।’ এরপর সবাইকে গ্রেফতার দেখানো হয়। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আসামিকে দেশে ফেরত আনার উদ্যোগ নেবে কমিশন। শিগগিরই এ ব্যাপারে কমিশন নির্দেশনা দেবে। সে অনুসারে আমরা কাজ শুরু করব।’ সূত্র জানায়, পিকে হাল ট্রাভেলসসহ চারটি ভুয়া কোম্পানির নামে ও হুন্ডির মাধ্যমে ভারতে অর্থ পাচার করেছে।

পিকে সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ৩৪ মামলা : পিকে হালদার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত ৩৪টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় দুই হাজার কোটি টাকার ওপর আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। ৮৩ ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা হয়েছে।

প্রায় এক হাজার কোটি টাকা মূল্যের স্থাবর সম্পদ (জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট ইত্যাদি) ক্রোক করা হয়েছে। ৬৪ জন আসামি ও অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞাও জারি হয়েছে। এছাড়া এসব মামলায় আদালতে ১১ জন আসামি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।

১২ জন আসামি মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন। দুদক সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত তিনটি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। তদন্তে অর্থ লোপাটের প্রমাণ ও রেকর্ডপত্র পাওয়া গেছে। শিগগিরই ওই তিন মামলার তদন্ত রিপোর্ট কমিশনে দাখিল করা হবে।

অবৈধ সম্পদের মামলা : ২০২১ সালের শেষের দিকে পিকে হালদারসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হয়েছে। এতে বলা হয়, অবৈধ পন্থায় পিকে হালদার ৪২৬ কোটি টাকার জ্ঞাতআয়বহির্র্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন।

অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের প্রকৃত অবস্থান গোপন করার উদ্দেশ্যে পিকে নিজ নামে-বেনামে তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাগুজে কোম্পানির ও ব্যক্তিদের নামে ১৭৮টি ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করেন। হিসাবগুলোতে ৬ হাজার ৭৬ কোটি ৫১ লাখ ৮৬ হাজার ৪৬০ টাকা উত্তোলনের মাধ্যমে অস্বাভাবিক লেনদেনে হস্তান্তর, রূপান্তর ও স্থানান্তর করেন।

তার সহোদর আসামি প্রিতিশ কুমার হালদারসহ তদন্তে ১৩ আসামির পরস্পর যোগসাজশে বাংলাদেশ থেকে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ভারত, কানাডায় অর্থ পাচার করে। ২০২০ সালের ৮ জানুয়ারি ২৭৪ কোটি ৯১ লাখ ৫৫ হাজার ২৫৫ টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলাটি করা হয়।

মামলায় শুধু পিকে হালদারকে আসামি করা হয়। তবে চার্জশিটে পিকেসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। অবৈধ সম্পদের মামলায় অদ্যাবধি ৬৭ লাখ ৯০ হাজার ৯২৫ শতাংশ জমি, ৪টি ফ্ল্যাট, একটি ২০ হাজার ২৫৭ বর্গফুটের ১০ তলা ইমরাত জব্দ করা হয়েছে।

এসবের দলিল মূল্য ৩৯১ কোটি টাকা হলেও বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। ২২টি গাড়িও জব্দ করা হয়েছে। যার দলিল মূল্য ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৬৯ হাজার ৩৩৭ টাকা। এছাড়া ফ্রিজ (অবরুদ্ধ) করা ১৭৮টি ব্যাংক হিসাবে স্থিতি রয়েছে ১০ কোটি ৩৯ লাখ ৪৬ হাজার ৯০৬ টাকা।

পিকের সহযোগীরা কে কোথায় : পিকে হালদারের বিরুদ্ধে চারটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় সাত হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগে ৩৪টি মামলা হয়েছে।

এসব মামলায় প্রায় শতাধিক আসামি রয়েছেন। যাদের মামলার এজাহারে পিকে হালদারের সহযোগী হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। পিকে হালদারের সহযোগীদের মধ্যে অবন্তিকা বড়াল, নাহিদা রুনাই, সুকুমার মৃধা, শংখ ব্যাপারী, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের এমডি রাশেদুল হক, ডিএমডি আবেদন হোসেন, রাফসান রিয়াজ, ফাস ফাইন্যান্সের এমডিসহ ১২ জন কারাগারে আছেন।

বাকিরা সবাই পলাতক। এছাড়া ২০২১ সালের শুরুতে উচ্চ আদালত পিকে হালদারের ২৫ সহযোগীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেন।

এরা হলেন-ফাস ফাইন্যান্সের হারুনুর রশিদ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গর্ভনর এসকে সুর চৌধুরী, পিকে হালদারের বন্ধু উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সামি হুদা, পিকে হালদারের চাচাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অবন্তিকা বড়াল, ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের শামীমা, রুনাই, সাবেক সচিব ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের চেয়ারম্যান আই খান, আয়কর আইনজীবী সুকুমার মৃধা, অনিন্দিতা মৃধা, তপন দে, স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অভিজিৎ চৌধুরী, রাজিব সোম, ব্যাংক এশিয়ার সাবেক এমডি ইরফানউদ্দিন আহমদ চৌধুরী, অঙ্গন মোহন রায়, নঙ্গ চৌ মং, নিজামুল আহসান, মানিক লাল সমাদ্দার, সোহেল শামস, পিকে হালদারকে তথ্য দিয়ে সহায়তাকারী মাহবুব মুসা, একিও সিদ্দিকী, মোয়াজ্জেম হোসেন ও পিকে হালদারের মা লীলাবতী হালদার।

পিকে হালদার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএলএফএসএলেরও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। গ্রাহকদের অভিযোগের মুখে ২০২১ সালের শুরুতেই তিনি বিদেশে পালিয়ে যান।

বন্দি বিনিময় চুক্তিতে পিকে হালদারকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব-যুগান্তরকে দুদক আইনজীবী : পিকে হালদার ও সুকুমার মৃধা বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচারকৃত অর্থ ফেরত আনা যাবে বলে জানিয়েছেন দুদকের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, ভারতীয় কর্তৃপক্ষ যদি নিশ্চিত করে এই অর্থ বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে, তাহলে আদালতের মাধ্যমে আমরা সেটা জব্দ করতে পারব।

একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় পিকে হালদারকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে যাওয়া পিকে হালদার এবং তার কিছু সহযোগীর পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন সম্পত্তিতে অভিযান চালায় ভারতের এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। এদিকে শনিবার পিকে হালদারকে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে ভারত থেকে কূটনীতিক সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করে।

এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বলেন-সংবাদমাধ্যম থেকে খবর পেয়েছি, পিকে হালদারসহ ছয়জন ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। পিকে হালদার, সুকুমার মৃধা বাংলাদেশ থেকে ভারতে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছেন।

পিকে হালদারের পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ সম্পত্তির বিষয়ে দুদক বা বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীর বাহিনীর পক্ষ থেকে ভারতের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছিল। এ বিষয়ে ‘মিউচ্যুয়াল লিগ্যাল অ্যাসেসমেন্টের’ মাধ্যমে সহায়তা চাওয়া হয়। ভারতে পিকে হালদারের অর্থ পাচারের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে।

পিকে হালদারকে বাংলাদেশে ফেরত আনা হবে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে খুরশীদ আলম খান বলেন, ভারতের সঙ্গে বন্দি বিনিময় চুক্তির আওতায় পিকে হালদারকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যেতে পারে। তিনি (পিকে হালদার) সেখানে কোনো অপরাধ করলে সে দেশের সরকার তার বিচার করবে।

তিনি বলেন, পিকে হালদার যদি ভারতীয় আইনে অপরাধ করে থাকেন তাহলে আমার মনে হয় সে বিচার শেষ করতে বেশি সময় লাগবে না। আমাদের বন্দি বিনিময় চুক্তিতে বলা আছে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির কথা। তিনি বলেন, দেশে ফিরিয়ে আনার সঙ্গে সঙ্গে যে মামলাগুলোর অভিযোগপত্র এখনও দেওয়া হয়নি-সেগুলোর অভিযোগপত্র দিতে প্রস্তুত আছে দুদক।

দুদক আইনজীবী বলেন, পিকে হালদারের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের ৩৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটির তদন্ত শেষ হয়েছে, বাকিগুলো তদন্তাধীন। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদের একটি মামলার বিচার চলছে। তিনি বলেন, পিকে হালদার বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যক্তির নামে ১৭৮টি ব্যাংক হিসাবে প্রায় ৬ হাজার ৮১ কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেন করেছেন বলে নিশ্চিত হয়েছে দুদক।

এ ছাড়া ৪২৬ কোটি টাকার জ্ঞাতআয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন পিকে হালদার। অর্থ পাচারের বেশ কিছু তথ্য দুদকের কাছে এসেছে। সব মিলিয়ে পাচারকৃত অর্থের পরিমাণ হবে ১০ হাজার কোটির টাকার উপরে।

তিনি আরও বলেন, অর্থ পাচারে পিকে হালদারের সঙ্গে তার সহযোগী আরও ১৩ জন রয়েছেন। তারা হলেন পিকে হালদারের মা লীলাবতী হালদার, বান্ধবী অবন্তিকা বড়াল, সহযোগী ও ঘনিষ্ঠজন শঙ্খ ব্যাপারী, সুকুমার মৃধা, অনিন্দিতা মৃধা, পূর্ণিমা রানী হালদার, উত্তম কুমার মিস্ত্রি, অমিতাভ অধিকারী, প্রীতিশ কুমার হালদার, রাজীব সোম, সুব্রত দাস, অনঙ্গ মোহন রায় ও স্বপন কুমার মিস্ত্রি। এদের বিরুদ্ধে মামলায় বিচার চলছে।

এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক এমডি ছিলেন প্রশান্ত কুমার হালদার (পিকে হালদার)। আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুসহ সিন্ডিকেটের সহায়তায় কয়েকটি লিজিং কোম্পানি থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা সরিয়ে পিকে হালদার দেশ থেকে সটকে পড়েন। এ অর্থের বড় একটি অংশ কানাডা, ভারত ও সিঙ্গাপুর পাচার করেন তিনি।

পিকে হালদারের সহযোগী শনাক্তে হাইকোর্টে আবেদন করবে রাষ্ট্রপক্ষ : ভারতে গ্রেফতার পিকে হালদারের অর্থ পাচার ও বিদেশে পালিয়ে যেতে কারা কারা সহযোগিতা করেছে তাদের চিহ্নিত করতে উচ্চ আদালতে যাচ্ছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা। কাল হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চে বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল একেএম আমিন উদ্দিন মানিক।

শনিবার রাতে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, পিকে হালদার সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। তার বিরুদ্ধে ৩৭টি মামলা রয়েছে। হাইকোর্টে তার বিরুদ্ধে সুয়োমোটো রুল বিচারাধীন আছে। এ অবস্থায় পিকে হালদার ভারতে গ্রেফতার হয়েছেন। তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তিনি বলেন, এই অর্থ পাচার এবং তাকে বিদেশে পালিয়ে যেতে কারা কারা সহযোগিতা করেছেন তা জাতি জানতে চায়। তাই রাষ্ট্রপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিষয়টি উচ্চ আদালতে উপস্থাপন করার।

পাসপোর্ট জব্দে হাইকোর্টের নির্দেশ থাকার পরও পিকে হালদার কীভাবে দেশ থেকে পালিয়েছে, তা জানতে গত গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি আদেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। পরে পিকে হালদারের দেশত্যাগের সময় বেনাপোল স্থলবন্দরে দায়িত্বরত ৬৭ ইমিগ্রেশন পুলিশের তালিকা হাইকোর্টে দাখিল করা হয়। পাশাপাশি দেশ থেকে অর্থ পাচারকালীন ২০০৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কর্মরত ৩৫৪ জন কর্মকর্তার নাম-ঠিকানাসহ তালিকা জমা দেয় কর্তৃপক্ষ।

ওইদিন দুদক আদালতকে জানায়, পিকে হালদারের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার চিঠি ইমিগ্রেশন গ্রহণ করেছে ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে দশটায়।

এমন তথ্য আদালতকে অবহিত করায় এখন প্রশ্ন উঠেছে দুদক এবং ইমিগ্রেশন পুলিশের তথ্যের সত্যতা নিয়ে। কারণ এর আগে ইমিগ্রেশন জানিয়েছিল, দুদকের চিঠি পাওয়ার দুই ঘণ্টা ৯ মিনিট আগেই ওইদিন (২৩ অক্টোবর) বিকাল ৩টা ৩৮ মিনিটে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান তিনি।

শুনানি শেষে আদালত, পিকে হালদারের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা সংক্রান্ত বিষয়ে লিখিত আকারে জানাতে দুদক ও ইমিগ্রেশন পুলিশকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।

“পি কে হালদারের পাচার হওয়া টাকা ফেরত আনা হবে”ভারতে গ্রেপ্তার হওয়া পি কে হালদারের পাচার করা অর্থ ফেরত আনা হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া তথ্যেই ভারতে পি কে হালদার গ্রেফতার হয়েছেন। এটা একটা বড় সাফল্য।

রবিবার (১৫ মে) দুপুরে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন।

ভারতে পাচার হওয়া টাকার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, পি কে হালদারের পাচার করা টাকাটা আমাদের। ভারতের সঙ্গে আমাদের চুক্তি আছে। এছাড়াও একটা চুক্তি আছে এমএলএফ। এর মাধ্যমে আমরা টাকাটা ফেরত আনার চেষ্টা করব। এর আগে বাংলাদেশে শুধু একবারই টাকা এসেছিল। আরাফাত রহমান কোকোর টাকা, যেটা সিঙ্গাপুরে ছিল। পি কে হালদারের টাকাটা যেহেতু আটকানো গেছে, আশা করি দ্রুতই এ টাকা ফেরত আনতে পারব।

আরেক প্রশ্নের জবাবে এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, পি কে হালদার দেশে ফেরত আসুক না-আসুক সেটা বিষয় নয়, মামলার বিচার কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে শুরু হয়ে গেছে। মামলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিচার কার্যক্রমের একটা ধাপ তদন্ত পর্যায়ে আছে। এখন তাকে নিয়ে আসা হলে বিচারের সম্মুখীন করা হবে আর আনা না হলেও বিচার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। যখন তাকে আনা হবে, তখন বিচারে যে রায় হবে, সেটা কার্যকর করা হবে।

ads