জ্বালানি খাতে বাংলাদেশ ও ব্রুনাই সহযোগিতা জোরদারে সম্মত

Header

রিপোর্টিং : বাংলাদেশ ও ব্রুনাই জ্বালানি খাতে, বিশেষ করে বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়ম পণ্য সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার কৌশল খুঁজে বের করতে সম্মত হয়েছে।

রবিবার সন্ধ্যায় ব্রুনাই দারুস সালামের সুলতান হাজী হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জুদ্দিন ওয়াদ্দৌলাহর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফর উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ও ব্রুনাই দারুস সালামের এক যৌথ বিবৃতিতে এ কথা বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, ব্রুনাই দারুস সালাম তার অব্যাহত উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের অবদানের কথা স্বীকার করে।

বাংলাদেশ ও ব্রনাই দারুস সালাম সংশ্লিষ্ট খাতে বাংলাদেশ থেকে ব্রুনাই দারুস সালামে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে দক্ষ ও পেশাদারসহ আরও শ্রমিক নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে সম্মত হয়েছে। উভয় পক্ষই স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও নৈতিকতার সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনায় সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ ব্রুনাই দারুস সালামকে বাংলাদেশের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগের সুযোগ-সুবিধা গ্রহণের প্রস্তাব করেছে।

ব্রুনাই দারুস সালাম প্রস্তাবটি বিবেচনায় নিয়েছে এবং উভয় দেশের পারস্পরিক সুবিধার স্বার্থে বিনিয়োগ সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশটি বাংলাদেশকে খাদ্য, কৃষি ও অ্যাকোয়াকালচারের মতো অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যমূলক কর্মকা-ে বিনিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করার আমন্ত্রণ জানিয়েছে।

উভয় পক্ষই বাণিজ্য ও বিনিয়োগকে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং দ্বিমুখী বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, যা বর্তমানে সম্ভাবনার অনেক নিচে। উভয় পক্ষ বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ব্রুনাই দারুস সালামের অর্থ ও অর্থনীতি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে ব্যবসা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহযোগিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্ধিত ব্যবসা-ব্যবসা সম্পর্ক এবং সহযোগিতার জন্য সহায়তা চাওয়ার একটি প্রক্রিয়ার সম্ভাবনা অন্বেষণের আলোচনাকে স্বাগত জানায়। উভয় পক্ষ হালাল বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করতে সম্মত হয়ছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে ব্রুনাই দারুস সালামের সুলতান ও ইয়াং দি পারতুয়ান হাজী হাসানাল বলকিয়াহ মুইজ্জুদ্দীন ওয়াদ্দৌলাহ ১৫-১৬ অক্টোবর বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সফর করেন।
এটি ছিল ব্রুনাই দারুস সালামের কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের বাংলাদেশে প্রথম সফর। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সুলতানকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানান এবং তাকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। তিনি বাংলাদেশের একাত্তরের শহীদ মুক্তিযুদ্ধের বীরদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সফরকালে সুলতান বঙ্গভবনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ করেন। রাষ্ট্রপতি সুলতানের সম্মানে একটি ভোজের আয়োজন করেন। ব্রুনাইয়ের সুলতান এখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করেছেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন ব্রুনাই দারুস সালামের সুলতানের সাথে তার আবাসস্থলে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও সুলতানের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা উষ্ণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের সকল দিক পর্যালোচনা করেন।
দুই নেতা সন্তোষের সাথে স্বীকার করেন যে ২০১৯ সালের ২১-২৩ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ব্রুনাই দারুস সালাম সফর এবং ২০২২ সালে সুলতানের প্রথম বাংলাদেশ সফরের মাধ্যমে দু’দেশের সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

উভয় পক্ষই বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে বিদ্যমান দৃঢ় অভিন্নতা এবং সমৃদ্ধি, শান্তি ও স্থিতিশীলতার যৌথ দৃষ্টিভঙ্গির পরিপ্রেক্ষিতে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে একসঙ্গে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
সুলতান বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্বের প্রশংসা করেন।

ads

ব্রুনাই দারুস সালাম ও অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি রক্ষায় সুলতানের অনন্য সাধারণ নেতৃত্বের জন্য প্রধানমন্ত্রী তাকে অভিনন্দন জানান।
উভয় নেতা বিদ্যমান সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে বিভিন্ন স্তরে বর্ধিত মিথস্ক্রিয়া এবং সম্পৃক্ততার গুরুত্বের পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর জোর দেন। দুই নেতা পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত বৈঠকসহ দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার করতে সম্মত হন। উভয় পক্ষই কোভিড-১৯ মহামারীর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাবের কঠিন সময়ে ব্রুনাই দারুসসালামে বসবাসকারী ও কর্মরত বাংলাদেশী প্রবাসীদের সহায়তা প্রদানের জন্য সুলতানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।
২০১৯ সালে স্বাক্ষরিত কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য সহযোগিতা সম্পর্কিত সংশ্লিষ্ট সমঝোতা স্মারকের কথা স্মরণ করে উভয় পক্ষই এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় সম্ভাব্য প্রকল্পগুলো অনুসন্ধানের জন্য উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনার কথা জানায়।
উভয় পক্ষই এ প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেয়ার জন্য ব্রুনাই দারুসসালামে চলতি বছরের নভেম্বরে জয়েন্ট এগ্রিকালচার ওয়ার্কিং কমিটির (জেএডব্লিউসি) বৈঠক আহ্বানের অপেক্ষায় রয়েছে।

উভয় পক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য মানসম্মত শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেছে। বাংলাদেশ উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান অব্যাহত রাখার মাধ্যমে ব্রুনাই দারুসসালামের সদিচ্ছার প্রশংসা করেছে। তারা পারস্পরিক সুবিধার জন্য উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে সহযোগিতার সুযোগ আরও গভীর ও প্রসারিত করতে সম্মত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা খাতে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান সক্ষমতা এবং ব্রুনাই দারুসসালামের আধুনিক ও উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামোর সক্ষমতা প্রসঙ্গে উভয় পক্ষই স্বাস্থ্যসেবা পেশাদারদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের জন্য স্বাস্থ্য খাতের সহযোগিতার বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করেছে যা বিশেষায়িত সেবা ও ফার্মাসিউটিক্যাল সেবা, সেইসঙ্গে সহযোগিতার অন্যান্য সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলোতে উভয় দেশের ক্ষেত্রে পারস্পরিক কল্যাণজনক হতে পারে।

দুই নেতা পারস্পরিক কল্যাণে আইসিটি, গ্রিন টেকনোলজি, সমুদ্র অর্থনীতি ইত্যাদিসহ নতুন ও উদীয়মান ক্ষেত্রগুলোতে কাজ করতে সম্মত হন।
আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর জোর দিয়ে দুই নেতা বিদ্যমান প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং মানবিক কার্যক্রমের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে সম্মত হন।

উভয় পক্ষই বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যে আকাশ ও সমুদ্র পথে সংযোগের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে আরও ভাল যোগাযোগের জন্য বেসরকারি খাতের অপারেটরদের সম্পৃক্ত হতে উৎসাহিত করতে সম্মত হয়।
উভয় পক্ষ পারস্পরিক স্বার্থ ও অভিন্ন অবস্থানের বিষয়ে জাতিসংঘ, ওআইসি, কমনওয়েলথ এবং এআরএফ সহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে সম্মত হয়েছে।

ব্রুনাই দারুসসালাম আসিয়ানের সাথে সম্পর্ক জোরদার করার জন্য বাংলাদেশের অব্যাহত আগ্রহের প্রশংসা করেছে এবং আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রয়াসের প্রতি সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ, নিশ্চিত, টেকসই এবং মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে বাংলাদেশে সাময়িকভাবে আশ্রয়প্রাপ্ত মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে আগত ১০ লাখের বেশী বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিকে দ্রুত প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমর্থনের জন্য ব্রুনাই দারুসসালামের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।

সুলতান বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের প্রতি বাংলাদেশের উদারতা এবং আশ্রয় প্রদানের প্রশংসা করেন এবং আশ্বাস দেন যে, তার সরকার এ অঞ্চলের সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি টেকসই সমাধানের জন্য বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়ে যাবে।
দুই নেতা নিম্নোক্ত দ্বিপাক্ষিক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষরকে স্বাগত জানান এবং প্রত্যক্ষ করেন। তারা চুক্তিগুলোর বিধানাবলীর দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য তাদের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বিমান পরিষেবা চুক্তি, বাংলাদেশী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান/নিয়োগ সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক, প্রশিক্ষণের মান সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক কনভেনশনের বিধানের অধীনে ইস্যুকৃত প্রশংসাপত্র স্বীকৃতির বিষয়ে এমওইউ, ১৯৭৮ সালে সংশোধিত সমুদ্রগামীদের জন্য সনদপত্র ও নজরদারি, এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং অন্যান্য পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহে সহযোগিতার ক্ষেত্রে সুলতান ও ব্রুনাইয়ের ইয়াং ডি-পার্টুয়ান এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক।

সুলতান ও প্রতিনিধিদলকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও উদার আতিথেয়তা দেয়ার জন্য ব্রুনাইয়ের সুলতান বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
উভয় পক্ষ পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, সুলতানের এ সফর বাংলাদেশ ও ব্রুনাই দারুসসালামের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে।
তারা দুই ভ্রাতৃপ্রতিম দেশের পারস্পরিক কল্যাণের লক্ষ্যে আরও জোরদার ও গভীর অংশীদারিত্বের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *