আমি শেখ মুজিবের মেয়ে অন্যায়ের কাছে কখনও মাথানত করিনি, করব না : প্রধানমন্ত্রী

Header

রির্পোটিং ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে গিয়ে তাঁকে অনেক চাপ সহ্য করতে হয়েছে উল্লেখ করে বলেছেন, ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি পদটি রক্ষার লোভে হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে বিশ^ব্যাংকের মাধ্যমে এই পদ্মা সেতুর অর্থায়ন বন্ধ করায়। তারা ভেবেছিল যে আমরা এখানে সারেন্ডার করব। কিন্তু আমি শেখ মুজিবের মেয়ে এটা মনে রাখা উচিত। শেখ হাসিনা কখনও অন্যায়ের কাছে মাথানত করেনি, করবও না। কারণ সততা আর দেশের জনগণই আমার শক্তি। আর এই দেশ এবং দেশের মানুষকে আমি ভালবাসি। কাজেই এদেশের মানুষের মাথা হেট হোক সেটা মেনে নেব না, সে কাজ কোনদিন করব না। স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার রাতে কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ বিধিতে পদ্মা সেতু নির্মাণে সাহসী ভূমিকা পালনের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাতে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমাকে অনেক চাপ দেয়া হয়েছে, কিন্তু আমি দমে যায়নি। কারণ আমার কাছে সততাই বড় শক্তি। ক্ষমতা আমার কাছে বড় কিছু না, ক্ষমতা আমার কাছে মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ সেটাই করে যাচ্ছি। এই দেশের মানুষ যেন গরিব বা দরিদ্র না থাকে, কোন মানুষ ভূমিহীন-গৃহহীন থাকবে না। দেশবাসীর সমর্থনই আমার কাছে বড় শক্তি। পরে সর্বসম্মতিক্রমে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০১ সালে আমেরিকা চাপ দিয়েছিল গ্যাস বিক্রি করার জন্য, আমি বিক্রি করিনি। তারা বলেছিল গ্যাস বিক্রি না করলে ক্ষমতায় আসতে দেবে না। তখন আমি তাদের কথা রাখিনি। ক্ষমতায় আসতে পারিনি। খালেদা জিয়া মুচলেকা দিয়েছিল সে ক্ষমতায় এসেছিল। এটা তো আমাদের চোখের সামনে হয়েছে। খালেদা জিয়া মুচলেকা দিয়েছে সে ক্ষমতায় গেছে। আজ অনেকে নির্বাচন নিয়ে অনেক বড় কথা বলে, কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে কি হয়েছে তা দেশবাসী জানে।

সংসদ নেতা বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে আমার ওপর অনেক চাপ এসেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট তার শেষ কর্মদিবসে সে একটা স্বাক্ষর করে বন্ধ করে দিয়ে গেছে টাকা। তার পর চাপ আসলে অমুককে গ্রেফতার করতে হবে, অমুককে গ্রেফতার করতে হবে তাহলে টাকা দেবে। আমি বলেছি আমার কোন অফিসারকে বা আমার কাউকে আমি অপমান করতে দেব না। আপনাদের টাকা লাগবে না। পারলে নিজেরা করব, না পারলে করব না।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ড. ইউনূস এমডি পদের জন্য দেশের এত বড় ক্ষতি করেছে। মানুষ কিভাবে একটি পদের জন্য দেশের করে? যে সমস্ত ইমেল দুদকের চেয়ারম্যান গোলাম রহমানের কাছে পাঠানো হয়েছে, সব সেন্ড করা আছে। এই যে দেশের বিরুদ্ধে কাজ করা, এদের কী কোন দেশপ্রেম আছে? আমরা বিশ্বব্যাংকের দোষ দিচ্ছি না, কিন্তু ওয়ার্ল্ড ব্যাংক দিয়ে এসব করানো হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বব্যাংককে বলেছি কোন টাকা ছাড় হয়নি তাহলে দুর্নীতি হলো কোথায়? আমি তাদের কাছে ডকুমেন্ট চেয়েছিলাম। তারা একটা কাগজও দিতে পারেনি। তারপর আসল অমুককে গ্রেফতার করলে টাকা দেবে, এ ধরনের প্রস্তাব। আমি বললাম পদ্মা সেতু আমি করব না। যে দিন নিজের টাকায় করতে পারব সেই দিন করব। আমাকে ভয় দেখায় যদি এটা না হয় আপনার নির্বাচনের কি হবে? জবাবে বলেছি জনগণ ভোট না দিলে ক্ষমতায় আসব না, তবুও কোন অন্যায়ের সহ্য করব না।

তাঁর পুরো পরিবারের ওপর মানসিক চাপ প্রয়োগের কথা উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, একটা মানসিক যন্ত্রণা আমার পরিবারের ওপরে ফেলে। আমার মেয়ে আমার ছেলে আমার বোন তাদের ওপর যে মানসিক চাপ পড়ে। জয়কে নিয়ে যখন স্টেট ডিপার্টমেন্ট বলছে তোমার মাকে বল তোমার বিরুদ্ধে অডিট হবে। তখন জয় বলেছে কর তবে আমি আমার মাকে এটা বলতে পারব না। আমার বিরুদ্ধে যত তদন্ত আছে করতে পার, আমি এখানে কোন অন্যায় করিনি। কাকে না তারা চাপ দিয়েছে। এই রকম অবস্থায় আমি কিন্তু মাথানত করিনি। আমার সততাটাই হচ্ছে আমার শক্তি আর বাংলাদেশের জনগণ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জনগণকে অপমান করে আমি কোন কিছু করব এটা হয় না। আমি যখন সিদ্ধান্ত নিলাম নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করব। এরপর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে দিলাম, তখনই সকলের টনক নড়ল। তখন বাংলাদেশকে সবাই সমীহ করতে শুরু করল যে, সত্যিই বাংলাদেশ পারে। জাতির পিতা বলেছিল কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না। কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারে নাই, পারবেও না ইনশাআল্লাাহ। এই দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।

সরকারপ্রধান বলেন, এখনা সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা প্রত্যেকটা জিনিসের দাম বেড়েছে। ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে। আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) বাজেট দিচ্ছি। বাজেটও ঠিকমতো দেব তবে সবাইকে কৃচ্ছ সাধন করতে বলব। এক ইঞ্চি জমি যেন না পড়ে না থাকে। খাবারের ব্যবস্থা নিজেদেরই করতে হবে। আমেরিকা-ইউরোপে প্রত্যেক দেশে মন্দা। সবাইকে মিতব্যয়ী হতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতু আমাদের আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে, টেকনোলজি সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের জ্ঞান হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও উন্নত কাজ করতে পারব। বাংলাদেশে যে নিজেরা পারে এটাই বাংলাদেশের মর্যাদা সারা বিশ্বে উজ্জ্বল করেছে। জাতির পিতা স্বাধীনতা দিয়ে গেছেন লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে এই স্বাধীনতা। আমাদের একটা খারাপ সময় গেছে। ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতায় আছি বলে উন্নয়ন করতে পেরেছি, পদ্মা সেতুও করতে পারলাম। এজন্য বাংলাদেশের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।

শেখ হাসিনা বলেন, যখন বলেছি নিজের টাকায় পদ্মা সেতু করব এদেশের মানুষ এগিয়ে এসেছে। এখনও আমার কাছে চেক দিয়েছে, সেই চেকগুলো এখনও আছে। আমি চেকগুলো ভাঙায়নি। রেখে দিয়েছি। কারণ আমরা তো টাকা জোগার করে শুরু করে দিয়েছি। আমরা করতে পারব সেই আত্মবিশ্বাস আমার ছিল। আমরা নিজেদের অর্থায়নে করেছি।

ads

সংসদ নেতা বলেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে ‘বাংলাদেশ করতে পারে’ এমন ধারণা তৈরি হয়েছে, যা সারা বিশ্বে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ যে নিজেরাও পারে সে ধারণা প্রতিষ্ঠিত করে বিশে^ বাংলাদেশের মর্যাদাকে উজ্জ্বল করেছে। আর এটা আমরা করতে পেরেছি আত্মবিশ^াসের জন্য। আমি মনে করি পদ্মা সেতু আমাদের মধ্যে আত্মবিশ^াস সৃষ্টি করেছে। টেকনোলজি সম্পর্কে আমাদের দেশের মানুষের জ্ঞান বেড়েছে। আমরা ভবিষ্যতে আরও অনেক উন্নত কাজ করতে পারব। পৃথিবীতে এই ধরনের বিশাল স্ট্রাকচারের সেতু আজ পর্যন্ত তৈরি হয়নি বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

পদ্মা সেতু নির্মাণে জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞতা : সংসদে প্রস্তাব পাস

স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে দৃঢ়-সাহসী নেতৃত্বের জন্য দেশবাসীর পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী-নেতারা বলেছেন, পদ্মা সেতু শুধু একটি সেতু নয়, এটি এখন দেশের সার্বভৌমত্ব, গোটা জাতির আত্মমর্যাদা, সক্ষমতা, দৃঢ়তা ও আমাদের অপমানের প্রতিশোধের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকল অসত্য ও ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে পদ্মা সেতু নির্মিত হয়েছে। এতে বদলে যাবে দক্ষিণাঞ্চলের ২১টি জেলার অর্থনৈতিক চিত্র। বঙ্গবন্ধু শেখ হাসিনার সততা, দৃঢ়তা, প্রজ্ঞা, সাহসিকতা ও বজ্রকণ্ঠের কাছে পরাজিত হয়েছে ষড়যন্ত্রকারীরা। যতদিন পদ্মা সেতু থাকবে, ততদিন ইতিহাসের পাতা থেকে শেখ হাসিনার নাম কেউ মুছে ফেলতে পারবে না। সারাবিশ্বকে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেনÑ বাঙালী জাতিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারে না, পারেওনি।

স্পীকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বুধবার জাতীয় সংসদে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে গোটা জাতির পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানিয়ে ১৪৭ বিধিতে আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন। দীর্ঘ প্রায় সাত ঘণ্টার আলোচনার পর রাত সাড়ে ১১টায় স্পীকার প্রস্তাবটি ভোটে দিলে সর্বসম্মতিক্রমে তা গৃহীত হয়। এ সময় সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানান।

সংসদে প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন চীফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিম-লীর সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক চীফ হুইপ আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ, আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মুহাম্মদ ফারুক খান, শাজাহান খান, শিক্ষামন্ত্রী ডাঃ দীপু মনি, সরকারী দলের অধ্যাপক ডাঃ আ ফ ম রুহুল হক, আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব, ড. আবদুস সোবহান মিয়া, কাজী নাবিল আহমেদ, সাগুফতা ইয়াসমীন এমিলি, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, এ্যাডভোকেট মৃণাল কান্তি দাস, ইকবাল হোসেন অপু, শেখ তন্ময়, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক, মহিলা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা, উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু, তরিকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভা-ারী, বিএনপির রুমিন ফারহানা, হারুনুর রশীদ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন (বাবলা), ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও বেগম রওশন আরা মান্নান। আলোচনার সময় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।

‘ফিফা ট্রফির বাংলাদেশ ভ্রমণে ক্রীড়াপ্রেমী তরুণরা উৎসাহিত হবে’ : ফিফা ট্রফির বাংলাদেশ ভ্রমণের ফলে দেশের ক্রীড়াপ্রেমীরা বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম উৎসাহিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার জাতীয় সংসদ ভবনের লবিতে ‘ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি’ বরণ উপলক্ষে আগত প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতকালে তিনি এ আশা প্রকাশ করেন। প্রতিনিধি সদস্যদের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী। এক সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় তিনি তাঁর পরিবারের সদস্যদের খেলাধুলায় বিশেষ করে ফুটবলের সঙ্গে সম্পৃক্ততা স্মৃতিচারণ করেন।

শেখ হাসিনা জানান, তাঁর পিতামহ, পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ভাইয়েরা অত্যন্ত ক্রীড়ামোদী ও ক্রীড়াবিদ ছিলেন। তার সন্তান এমনকি নাতি-নাতনিরাও ক্রীড়ামোদী ও ক্রীড়াবিদ। বাংলাদেশে বিশ্বকাপ ট্রফির আগমনে ফিফা, কোকাকোলা ও বাফুফে কর্তৃপক্ষকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

ads

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *